হাওজা নিউজ এজেন্সি: ফিকহের উচ্চতর এক পাঠ (দারসে খারিজ) শুরুর আগে দেওয়া নৈতিক শিক্ষাবিষয়ক এক বক্তব্যে ‘শহীদ নেতা’ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী (রহ.) একটি হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পরিবারকে সন্তানের ব্যক্তিত্ব ও মূল্যবোধ গঠনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি ইমাম জাফর আস-সাদিক (আ.)-এর বর্ণিত একটি হাদিস উদ্ধৃত করেন—
إِنَّ خَيْرَ مَا وَرَّثَ الْآبَاءُ لِأَبْنَائِهِمُ الْأَدَبُ لَا الْمَالُ.
“নিশ্চয়ই পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের জন্য যে উত্তরাধিকার রেখে যান, তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো উত্তম চরিত্র (আদব), ধন-সম্পদ নয়।”
তিনি বলেন, পিতা সন্তানকে অর্থ, বাড়ি, জমি বা অন্যান্য সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এসবের চেয়েও মূল্যবান উত্তরাধিকার হলো আদব—অর্থাৎ উত্তম চরিত্র, নৈতিকতা, সুশিক্ষা ও সঠিক মূল্যবোধ।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, হাদিসের বর্ণনাকারী মুসা'দাহ ইবনে সাদাকাহ (রহ.) ‘আদব’ শব্দের অর্থ ‘ইলম’ (জ্ঞান) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এখানে জ্ঞান বলতে কেবল গণিত, পদার্থবিজ্ঞান বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বোঝানো হয়নি; বরং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে বোঝানো হয়েছে।
শহীদ খামেনেয়ী (রহ.)’র ভাষায়, একজন বাবা যখন সন্তানকে সত্যবাদিতা, সাহস, উদ্যম, পরিশ্রম, আত্মমর্যাদা ও সম্মানবোধের শিক্ষা দেন, তখন সেটিই প্রকৃত শিক্ষা এবং প্রকৃত জ্ঞান। কারণ এসব গুণই মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন করে।
তিনি বলেন, এই হাদিসের অন্যতম শিক্ষা হলো—মানুষের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ গ্রহণের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পরিবার। শিশুর চিন্তা, মানসিকতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবারের প্রভাব সবচেয়ে গভীর। তাই বাবা-মায়ের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি কথা এবং জীবনযাপন সন্তানের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামের মূল্যবোধ অনুযায়ী সন্তানদের কাছে সঠিক সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া পিতা-মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একই সঙ্গে সন্তানদেরও উপলব্ধি করা উচিত যে, তারা বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ অর্জন করে, তা পার্থিব সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
হাদিসটি পুনরায় উদ্ধৃত করে তিনি বলেন—
إِنَّ خَيْرَ مَا وَرَّثَ الْآبَاءُ لِأَبْنَائِهِمُ الْأَدَبُ لَا الْمَالُ.
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সন্তানদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি), পাপ থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, কোরআনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করা, আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির আকাঙ্ক্ষার শিক্ষা দিতে হবে।
তিনি বলেন, পরিবারই সেই প্রথম স্থান, যেখানে একটি শিশু এসব মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাই সন্তানদের সামনে কোরআন তিলাওয়াত করুন, দোয়া করুন এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা দিন।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, সন্তানদের সামনে কখনো মিথ্যা বলবেন না, গিবত করবেন না এবং ধন-সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত লোভ প্রদর্শন করবেন না। কারণ শিশুরা বড়দের আচরণ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করে। যদি তারা দেখে বাবা-মা গিবত করছেন, দুর্ব্যবহার করছেন, অন্যকে অপমান করছেন, দুনিয়াবি ক্ষমতা ও মর্যাদার সামনে নিজেদের ছোট করছেন এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছেন না, তবে তারাও সেই পরিবেশে বেড়ে উঠবে এবং প্রকৃত নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি হাদিসের শেষ অংশ উদ্ধৃত করেন—
فَإِنَّ الْمَالَ يَذْهَبُ وَالْأَدَبَ يَبْقَى
“ধন-সম্পদ একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু উত্তম চরিত্র ও নৈতিক শিক্ষা স্থায়ী থাকে।”
তিনি বলেন, অর্থ-সম্পদের মূল্য ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সন্তানকে দেওয়া উত্তম চরিত্র, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ সারাজীবন তার সঙ্গে থাকে এবং তার ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাই সন্তানদের চরিত্র গঠনের এই দায়িত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আপনার কমেন্ট